• ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

মহানবীর ব্যবসায়িক জীবন: বাণিজ্যিক কেন্দ্র-৩, সিরিয়ার নগরী ‘বুসরা

فَخَرَجَ مَعَ غُلامِهَا مَيْسَرَةَ وَجَعَلَ عُمُومَتُهُ يُوصُونَ بِهِ أَهْلَ الْعِيرِ حَتَّى قَدِمَا بُصْرَى مِنَ الشَّامِ
“তিনি (সা.) গোলাম মাইসারার সাথে রাওয়ানা হলেন আর তাঁর চাচা বাণিজ্যিক কাফিলাকে উপদেশ দিচ্ছিলেন; অবশেষে তারা শামের বুসরায় পদাগমণ করলেন।” [তাবাকাত ইবন সাদ, ২৮৮/১০১]

এটা সে শহর যে শহরে নিরাপদ বাণিজ্য করবার জন্য নবীজির প্রপিতামত কোনো এক বাইজেন্টাইন সম্রাটের সাথে চুক্তিপত্র রচনা করেছিলেন। এটা সে শহর যেখানে হিজাযের বণিকরা উত্তর সীমান্তে শেষবারের মতো তাঁবু ফেলতেন। এটা গাসসানী শাসকদের সে-ই রাজধানী যার প্রাসাদগুলো আম্মাজান আমিনা স্বপ্নে আলোকিত হতে দেখেছিলেন [মুসতাদরাক, ৪১০৫]]! এটা সে শহর নবীজি (সা.) অতি ছোট্র বয়সে আম্মাজানের মুখ থেকে তার নাম শুনেছেন যখন তিনি আরেক আম্মাজান হালিমার (রা.) সাথে আলাপ করছিলেন [আল-মাতলিবুল আলিয়া]।

এটা সে শহর যার উদ্দেশ্যে একবার চাচার সাথে বাল্যকালে বের হয়েছিলেন; কিন্তু কাছাকাছি দূরত্ব থেকে ফিরে এসেছিলেন। সে শহরের উপকন্ঠে কোনো এক গির্জার পাদ্রী এক দায়িত্ব ছিলো, গোপনে সে পথের দিকে তাকিয়ে শেষ নবীর পথযাত্রা সুরক্ষা করা; নবীরা এ পথ অতিক্রম করে থাকেন, শেষ নবীও করবেন; নবীরা সে বৃক্ষটির নিচে বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকেন, শেষ নবীও বিশ্রাম নিবেন; হয়তো কিতাব থেকে সুস্পষ্ট জ্ঞান পেয়েছিলেন কিংবা গণকের তথ্য পেয়েছিলেন হয়তো-বা ধারণা করেছিলেন। তারপর একের পর এক পাদ্রী সে দায়িত্ব পালন করতে করতে অবশেষে বুহাইরা-ই সে শুভক্ষণে পৌঁছে গিয়েছিলেন! নবীজি সে যাত্রায় উত্তরে কাফিলার শেষ সীমান্তে ‘সূক বুসরা’ তথা বুসরার বাণিজ্যিক কেন্দ্রে আর পৌঁছাতে পারেননি। [তিরমিযী, ৩৬২০]

এখন নবী পরিবারে পর্যাপ্ত সম্পদ নেই! অন্যদিকে এক দশক আগের স্মৃতিও অম্লান আবূ তালিবের। শামের ইহুদীরা নবীজির না-জানি কোনো ক্ষতি করে বসে। তবুও গত্যন্তর না পেয়ে আবূ তালিব যুবক মুহাম্মদকে (সা.) সে বাণিজ্যে শরীক হওয়ার অনুরোধ করছেন।

“নাফিসা বিনত উমাইয়া বর্ণনা দিচ্ছিলেন: রাসূলুল্লাহর (সা.) বয়স পঁচিশ বছরে উপনীত হলো। মক্কায় এখন তার নাম ‘আল-আমীন’!
কেননা, তার উত্তম গুণাবলীর কথা মানুষের মুখেমুখে। আবূ তালিব তাকে বললেন: ‘হে ভাতুষ্পুত্র! আমি এখন কপর্দকহীন ব্যক্তি; কালের যাতাকলে নিপতিত; মন্দায় আমরা জর্জরিত। অথচ আমাদের না আছে মূলধন, না আছে বাণিজ্য। এই যে তোমার বংশের বাণিজ্য কাফিলা সিরিয়া যাচ্ছে! খাদিজা বিনত খুওয়াইলিদ তোমার বংশের কিছু লোককে তার বাণিজ্য কাফিলায় পাঠাচ্ছে ‘তারা তার জন্য ব্যবসা করবে এবং মুনাফা অর্জন করবে; তুমি যদি তার কাছে যেতে, নিজেকে উপস্থাপন করতে; তবে নিশ্চয়-ই সে তোমাকে আগ বাড়িয়ে নিতেন এবং তোমার পবিত্রতা-যা ইতোমধ্যে সে অবহিত- ঐ কারণে অন্যদের থেকে তোমাকে প্রাধান্য দিতেন। আমি যদিও তোমার শাম যাত্রা অপছন্দ করি এবং তোমার বিষয়ে ইহুদিদের অনিষ্টতার ভয় করি; কিন্তু আমাদের যে এ ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই।’

আর খাদিজা ছিলেন একজন উদ্যেক্তা নারী যার সম্মান, সম্পদ এবং বাণিজ্য ছিলো। তিনি শামে কাফিলা পাঠাতেন। কুরাইশদের অন্যন্য কাফিলার মতোই তার বাণিজ্য কাফিলা ছিলো; তিনি লোক নিয়োজিত করতেন এবং তাকে মুদারাবা চুক্তিতে মূলধন দিতেন। কুরাইশরা ছিলো বণিক। যাদের বাণিজ্য নেই তাদের কিছু নেই।’

হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলিতে বিধৃত নবী জীবনের এ পর্যায়ের ঘটনাবলি নিবীড় পর্যালোচনার পর এ লেখকের কাছে প্রতিভাত হয়েছে যে, নবীজি (সা.) খাদিজার বাণিজ্য কাফিলা শামে পরিচালনার পূর্বে ইয়ামেনমুখি হুবাশা বাজারে বেশ কয়েকবার পরিচালনা করেছিলেন। হতে পারে আবূ তালিব, নবীজি ও খাদিজার এসব সংলাপ সে কাফিলা পরিচালনার পূর্বের। কোনো কোনো বর্ণনায় আবূ তালিব নবীজির বিষয়ে খাদিজার সাথে আলাপ করা এবং খাদিজা নবীজির সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া ইত্যাদি তা প্রমাণ করে। নবীজি (সা.) শামের বাণিজ্যের বিষয়ে খাদিজার থেকে প্রস্তাব প্রত্যাশা করা এবং খাদিজা কর্তৃক দ্বিগুণ মূলধন দেওয়া সে ধারণাকে আরো জোরদার করে।

‘…রাসূল্লাাহ (সা.) বলেন, ‘হয়তো সে আমার কাছে এ বিষয়ে ডেকে পাঠাবেন’। আবূ তালিব বলেন: ‘আমি আশঙ্কা করি অন্য কাউকে নিয়োজিত করে ফেলে, তোমার বিষয়টা পরে আশায় ঝুলে থাকে।’ তাদের কথা শেষ হয়ে যায়। খাদিজার কাছে চাচার সাথে তার কথোপকথন বিষয়ে কথা পৌঁছে। আর তারপূর্বে তিনি তাঁর সত্যবাদিতা, আমানদারিতা, চারিত্রিক মাধুর্য্যতা বিষয়েও জানতে পারেন। তিনি বলেন: ‘আমি জানি না সে তা এটা চাবে কি-না! তারপর তিনি তাঁকে সংবাদ দিলেন যে, ‘আপনাকে ডেকে পাঠাতে আমাকে উৎসাহিত করেছে আপনার সত্যবাদিতা, আমানদারিতা ও চারিত্রিক মাধুর্য্যতার সংবাদ; আপনাকে আমি দিবো আপনার বংশের অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ।’

তারপর নবীজি (সা.) সাক্ষাত করলেন এবং আবূ তালিবের সাথে মিলিত হলেন এবং বিষয়টি জানালেন। তিনি বলেন: ‘এটি অবশ্য এমন এক রিযিক যা আল্লাহ তোমার দিকে ধাবিত করেছেন।’ তারপর নবীজি (সা.) গোলাম মাইসারার সাথে শামের পথে বেরিয়ে পড়লেন এবং তার চাচা বাণিজ্যিক কাফিলাকে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়েছেন। তারা শামে পৌঁছে গেলেন এবং বুসরার বাজরে খ্রিস্টান পাদ্রীর এক গির্জার অনতিদূরে একটি গাছের ছায়ায় অবতরণ করলেন।”

নবীজি (সা.) বুসরার পথে যে সব স্থান ও শহরগুলোর অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তা জানার ক্ষেত্রে নিশ্চয়-ই পাঠকের আগ্রহ রয়েছে। মক্কা থেকে তখনকার বাণিজ্য কাফিলা ঠিক কোন কোন জনপদকে ছুঁয়ে বুসরার প্রান্ত সীমায় পৌঁছাতো? পাঠক! সে সব পড়তে পড়তে নবীজির সে কাফিলার সাথে পথ চলতে চলতে সে সকল জনপদে ভ্রমণ করতে থাকুন।

বস্তুত মক্কায় কোনো চাষাবাদ হতো না। এখানে কোনো বাগবাগিচা কিংবা ফলমূল চাষাবাদ ছিলো না। তাই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সফর ও বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ সংগ্রহ করার ওপরই মক্কাবাসীদের জীবিকা নির্ভরশীল ছিলো। মক্কাবাসীরা খুব দারিদ্র্য ও কষ্টে দিনাতিপাত করতো [জালালাইন]। নবীজির (সা.) প্রপিতামহ হাশিম কুরাইশকে ভিনদেশে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে উদ্বুদ্ধ করেন [কুরতুবী]।

কুরাইশদের জীবন ধারণের একমাত্র মাধ্যম ছিলো ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রতি বছর তাদের বাণিজ্যিক কাফেলা দু’বার করে অন্য দেশ সফর করতো এবং তারা সেখান থেকে ব্যবসার পণ্য নিয়ে আসতো। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের বাণিজ্য রয়েছে শীত ও গ্রীষ্ম সফরের’ [সূরা কুরাইশ:২]।

শীত ও গ্রীষ্মের সফরের অর্থ হচ্ছে গ্রীষ্মকালে কুরাইশরা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে বাণিজ্য সফর করতো। কারণ এ দু’টি ছিলো শীত প্রধান এলাকা। তারা শীতকালে সফর করতো দক্ষিণ আরব তথা ইয়ামানের দিকে। কারণ সেটি গ্রীষ্ম প্রধান এলাকা। শামের দিকের সফরের শেষ সীমানা ছিলো দু’টি। একটি ফিস্তিনের গাজা আরেকটি বুসরা। নবীজি (সা.) গাজায় কোনো বাণিজ্য কাফিলা পরিচালনা করার প্রমাণ মিলে না।

কিন্তু কুরাইশদের বাণিজ্য পথ ধরে তিনি শামের বুসরায় একবার কাফিলা পরিচালনা করেছেন। সম্ভবত সেখানকার পাদ্রীর সর্তকতার পর আর বুসরায় বাণিজ্য কাফিলা পরিচালনা করেননি। তবে সে পথ ধরে শামের অন্য শহর ‘আল-জারশ’-এ আরও দু’টি বাণিজ্য কাফিলা পরিচালনা করেন।

মক্কা থেকে কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলা প্রথম যে স্থানটি অতিক্রম করতো তার নাম ‘মররুজ্জাহরান’ যার বর্তমান নাম ‘ওয়াদী ফাতিমা’। তারপর ‘আসফান’ হয়ে রাবিগের পথে ‘আল-আবওয়া’। তারপর বদর হয়ে কোনো কোনো কাফিলা উত্তরের দিকে মদীনার পশ্চিমে ‘বুয়াত’ হয়ে খাইবর ও তাইমার পথে দুমাতুল জান্দাল হয়ে উত্তরের দিকে অগ্রসর হতো। কোনো কোনো কাফিলা বদরের পশ্চিম পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্র উপকূলের দিকে চেপে যেতো। তারপর ‘ইয়ানবূ হয়ে কখনোও কখনোও কাফিলা মদীনার বন্দর ‘ঈস’ হয়ে ‘আল-উলা’ পৌঁছাতো।

সেখান থেকে ‘আল-হিজর হয়ে ‘তাইমা’র পথে তাবুক পৌঁছাতো। তারপর তাবুক থেকে ‘মাআন’ হয়ে উত্তরের দিকে অগ্রসর হতো। কোনো কোনো কাফিলা ইয়ানবূ থেকে ‘আল-ওজাহ’ এবং ‘দুবা’ হয়ে বর্তমান ‘আল-বেদ’ নামক এলাকা দিয়ে মাদায়িন অতিক্রম করতো। মক্কা থেকে ইয়ানবূ পর্যন্ত পথের যে বিবরণ সনাক্ত করেছি তা কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলাকে বাধা দিতে নবীজির (সা.) যেসব ‘সারিয়া’ পাঠিয়েছিলেন তা থেকে অনুমান করা। তারপর ‘মাদয়ান’ পর্যন্ত যে পথের অনুমান তা পবিত্র কুরআনের সূরা হিজরের দু’টি আয়াতের সাথে মিল রেখে করা হয়েছে। কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলার সবচেয়ে সহজ, নিরাপদ ও পরিচিতি পথ সম্ভাবত এটিই। সূরা হিজরে হিজায থেকে শামের যাতায়াত পথের বর্ণনায় দু’টি ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের বিষয়ে বলা আছে।

“নিশ্চয় তা লোক চলাচলের পথের পাশেই বিদ্যমান। ….. আর এ জনপদ দু’টি প্রকাশ্য পথের পাশে অবস্থিত’ [আল-হিজর: ৭৬ ও ৭৯]।
আয়াত দুটিতে ‘সাবিলুন মুক্বীম’ ও ‘ইমামুন মুবীন’ শব্দযুগল একটি স্থায়ী ও প্রকাশ্য পথের কথা বলছে। অর্থাৎ এটা একটি সর্বসাধরণের রাস্তা যা দিয়ে দিনরাত সবসময় আসা-যাওয়া করা হয়। প্রত্যেক যাতায়াতকারীকে জনপদগুলোর উপর দিয়েই পাড়ি দিতে হয়। উভয় শহর বলতে নবী শুআইব ও নবী লূতের বসতিকে বুঝানো হয়েছে যারা একে অপরের কাছাকাছি ছিলো। লূতের শহর বলতে মোট পাঁচটি জনবসতি: সাদুম, সামূরা, সাবূরা, আমূরাহ, দূমাহকে বুঝায়। কুরআনে এদেরকে ‘আল-মু’তাফিকাত’ বলা হয়েছে [আল-হাক্কাহ: ৯]।

লূতের নগরীগুলোতে যে বিপদ ঘটে গেছে; যে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন পরিবর্তন ঘটেছে; পাথর নিক্ষিপ্ত হয়েছে, এমনকি শেষ পর্যন্ত তা পচা দুর্গন্ধময় সাগরে পরিণত হয়েছে; যা আজও একই অবস্থায় সে পথের ধারে বিদ্যমান রয়েছে [ইবন কাসীর]। জনপদগুলো এখন ‘ডেড সী’ কিংবা ‘মৃত সাগর’ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

শুআইব নবীর (আ.) এলাকা মাদয়ান যা বর্তমান ‘আল-বাদআ’র ‘মাগায়ির শুআইব’। এখান থেকে উত্তর দিকে বর্তমান জর্ডানে অবস্থিত ‘ওয়াদী শুআইব’ পর্যন্ত বিস্তৃর্ণ এলাকার দক্ষিণ অংশ ‘মাদয়ান’ আর একেবারে উত্তর অংশ ‘আইকা’। ‘আইকা’ অর্থ ঘন গাছপালা। এ জনপদে ঘন গাছপালা ছিলো তাই বাসিন্দারা ‘আয়কাবাসী’ নামে পরিচিত। হয়তো মাদয়ান ধ্বংসের পর নবী শুআইব ‘আইকা’ অঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন। শুআইব নবী এবং লূত নবীর বসতি একে অপরের সাথে যেন মিশে ছিলো। কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলা সে দু’টি জনপদের উপর দিয়ে পথ অতিক্রম করতো।

বাণিজ্য কাফিলা মাদয়ান অতিক্রম করে ‘মাদাবা’র উপর দিয়ে মৃতসাগর অঞ্চল অতিক্রম করতো। তারপর ‘আম্মানকে বামে রেখে আযরাকের উপর দিয়ে ‘আল-মাফরাকা’ হয়ে ‘বুসরা’ নগরে শেষ তাবু ফেলতো [দালীল আস-সিয়াহা আল-ইসলামিয়্যাহ ফিল মামলাকা আল-উরদুনিয়্যাহ আল-হাশিমিয়্যাহ]। আল্লাহ বলেন, “তোমরা তো তাদের ধ্বংসাবশেষগুলো অতিক্রম করে থাকো সকালে ও সন্ধ্যায়। তবুও কি তোমরা বোঝ না?” [সূরা আস-সাফফাত: ১৩৭-১৩৮]

পাঠক! আমরা এখন ‘বুসরা’ শহরটিতে রয়েছি! এখানে শহরটির ভৌগলিক অবস্থান ও প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। বুসরা শামের দক্ষণাঞ্চলীয় একটি শহর। অনেকে ইরাকের বসরা আর শামের বুসরাকে গুলিয়ে ফেলে! শামের বুসরা দক্ষিণ সিরিয়ার দারা প্রাশাসনিক এলাকায় দারা জেলায় অবস্থিত। এটা ‘হাওরানের’ পুরনো রাজধানী [আল-বাকরি, মুজাম মা, ১/২৫৩; আল-হামাভী, মুজাম, ১/৪৪১]।

এটি দামিস্ক থেকে ১৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং জর্ডান সীমান্ত থেকে ২০ কিলোমিটার ভিতরে অবস্থিত। পালমিরার পর সিরিয়ায় রোমানদের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে রোমানদের একটি থিয়েটার রয়েছে যা সালাউদ্দীন আইয়ূবী একসময় দূর্গ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। নবীজির সময়ে শহরটি বাইজেন্টাইন শাসনের অধীনে থাকলেও মূলত এটি ছিলো গাসসানী শাসনের রাজধানী। এখানে বাজারের কোনো প্রান্তে একটি বৃক্ষ ছিলো যার নিচে ঈসা (আ.) বসেছিলেন এবং পাশে নিসতূরা পাদ্রীর গির্জা ছিলো। তিনি বুহাইরা পাদ্রীর ছাত্র ছিলেন বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন [আমাকিন ফী হায়াতির রাসূল (সা.)]।

আমরা এখন বুসরার বাজারে! নবীজি (সা.) ও মাইসারা আছেন! পাদ্রী নিসতূরা এগিয়ে আসছেন! “…সে পাদ্রীর নাম ছিলো ‘নিসতূরা’। পাদ্রী মাইসারার দিকে এগিয়ে আসলেন। তিনি আগে থেকে-ই মাইসারার সাথে পরিচিত ছিলেন। তিনি বললেন: ‘হে মাইসারা! বৃক্ষটির নিচে অবতরণকারী এ লোকটি কে? সে বললো: ‘কুরাইশী! হেরেমের অধিবাসী!’ পাদ্রী বললো: ‘এ বৃক্ষের নিচে কখনোও কোনো নবী ছাড়া কেউ অবতরণ করেননি! তাঁর চোখে কী গৌর বর্ণ আছে? মাইসারা বললো: ‘হ্যাঁ।’ পাদ্রী বললো: ‘তাকে একা ছেড়ো না, এ-ই সেই! সর্বশেষ নবী। হায়! যদি আমি তাকে সে সময়ে পেতাম যখন তাঁকে দেশান্তরের আদেশ করা হবে।’ মাইসারা কথাটি মনে রাখলেন।

“ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) বুসরার বাজারে উপস্থিত হলেন। তিনি নিয়ে আসা পণ্য বিক্রি করলেন এবং আরো কিছু কেনা-বেচা করছিলেন। তম্মধ্যে এক ব্যক্তির সাথে তার পণ্য মূল্য নিয়ে কথা বাড়ছিলো। লোকটি তাঁকে বললেন: ‘লাত ও ওজ্জার শপথ করো!’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘আমি কখনো এ দুটি নামে শপথ করিনি। এ দু’টির বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি, এদের থেকে বিরত থাকো।’ লোকটি বললো: ‘ঠিক আছে, তোমার কথাই থাকলো।’

‘পাদ্রী মাইসারাকে দূরে নিঃসঙ্গে ডেকে নিয়ে বললেন: ‘হে মাইসারা! ইনি নবী! যার হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় ওনি তিনি-ই। আমাদের আলিমগণ তাদের কিতাবে তাঁর গুণাবলি পেয়েছেন।’ মাইসারা কথাটি মনে রাখলেন।

তারপর সমস্ত বাণিজ্য কাফিলা ফিরে চললো। মাইসারা রাসূলুল্লাহর (সা.) দিকে দৃষ্টি রাখলেন। ‘যখনি দ্বিপ্রহর হতো এবং উত্তাপ বেড়ে যেতো, মাইসারা তাকিয়ে দেখেন দু’জন ফেরেশতা তাঁকে সূর্যের উত্তাপ থেকে ছায়া দিচ্ছেন আর তিনি তাঁর উটের উপর আরোহী হয়ে পথে অতিক্রম করছেন।’ মাইসারা বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) খাদিজার বাণিজ্য নিয়ে আগমণ করলেন। খাদিজা অন্য সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি লাভ করলেন এবং নবীজিকেও যা নির্ধারিত মুনাফার চেয়ে বেশি প্রদান করলেন।” [ইবন নাঈম, দালাইল, ১১১]

এটা নবী জীবনে ‘বুসরা’র ঘটনা ও অভিজ্ঞতা। নবীজি (সা.) বুসারায় পথে পাড়ি দিয়েছেন। তিনি এ পথে বেশ কয়েকবার আসা-যাওয়া করেছেন। কিন্তু কখনো কী মৃত সাগর কিংবা ‘আগওয়ার শুআইব’ দেখেছেন?

আল্লাহ তাআলা বিশিষ্ট সীরাতকার ‘আল্লামা শিবলী নোমানী’র উপর রহম করুন। তিনি সে সম্ভবনার কথা স্বীকার করেছেন [সীরাতুন্নবী]। নবীজি (সা.) কোনো সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নেননি; কিন্তু ‘বাহরাইন’ সফরে ‘পারস্য সাগর’ দেখা এবং ‘শাম’ সফরে ‘মৃতসাগর’ দেখার বিষয়ে হয়তো নিশ্চিত করে কখনো-ই বলা যাবে না। তবে প্রবল সম্ভাবনাকে একেবারে বাতিল করে দেয়াও যায় না।

তারপর নবীজি (সা.) মক্কায় পনের বছর পর নবুওয়াত লাভ করেছিলেন। কিন্তু বুসরার ‘নিসতূরা’ পাদ্রী কী সে খবর রাখতেন? কিংবা সে বুসরাকে নবীজি কী মনে রেখেছেন আর? তাহলে শুনুন ‘আশারা মুবাশশিরা’র অন্যতম সদস্য ‘তালহা ইবন আবদিল্লাহর কথা।

“আমি বুসরার বাজারে উপস্থিত ছিলাম। এক পাদ্রী তার গির্জায় বলতেছিলেন: ‘এ মৌসুমের লোকদের জিজ্ঞাসা করো, ‘তাদের মাঝে হেরেমের কেউ কি আছে? তালহা বলেন: ‘আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। পাদ্রী বললো: ‘আহমদ কী পরে প্রকাশিত হয়েছেন?’ আমি বললাম: ‘আহমদ কে?’ পাদ্রী বললো: ‘ইবন আব্দিল্লাহ ইবন আব্দিল মুত্তালিব’; এ মাসে তিনি বের হবেন; তিনি সর্বশেষ নবী-হেরেম তার প্রকাশস্থান; খেজুঁর এবং পোড়াপাথুরে অঞ্চল তার হিজরতস্থল। তুমি দ্রুত তার দিকে অগ্রসর হও।’

তালহা বলেন: ‘সে যা বললো তা আমার হৃদয়ে গেঁথে গেলো। আমি দ্রুত মক্কার উদ্দেশ্যে বের হলাম। (গৃহে ফিরে) জিজ্ঞেস করলাম: ‘কোনো নতুন সংবাদ আছে?’ তারা বললো: ‘হ্যাঁ। মুহাম্মদ ইবন আব্দিল্লাহ আল-আমীন নবুওয়াতের দাবী করেছেন। আবূ কুহাফার পুত্র তাঁর অনুসারী হয়েছে।’ আমি বের হয়ে আবূ বকরের কাছে আসলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি এ ব্যক্তিকে অনুসরণ করেন?’ তিনি হ্যাঁ বললে তালহা বলেন: ‘আমাকে নবীজির কাছে নিয়ে চলুন, আমি তাঁর অনুসারী হবো, তিনি সত্যের দিকে-ই ডাকছেন। তারপর তালহা পাদ্রীর কথাগুলো আবূ বকরকে বললেন। তারা দু’জন নবীজির (সা.) কাছে উপস্থিত হলেন। তালহা ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং পাদ্রীর কথাগুলো বললেন। শুনে নবীজি (সা.) আনন্দিত হয়েছিলেন [মুসতাদরাক, ৫৫৫৭]।

এটা ৬১০ খ্রিষ্টাব্দ! মক্কায় নবীজির নবুওয়াতের অভিষেকের বছর। অন্যদিকে বাইজেন্টাইন শাসক হিরাক্লিয়াসের রাজক্ষমতার অভিষেকের বছর! আর বুসরা তার রাজ্যের একেবারে দক্ষিণ সীমান্ত! আকাশের তারকা গণনা করে হিরাক্লিয়াস ভয়ে তটস্থ! একটি তারকা যেনো রাজ্য বিলুপ্তির সংবাদ দিচ্ছে! আর তা রুখতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ইহুদিদের হত্যার পরামর্শ তার সভাসদে! অবশেষে বুসরার শাসক এক আরবকে পাঠিয়ে হিরাক্লিয়াসকে নবীজির সংবাদ পৌঁছে দিয়েছেন [মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, ৯৭২৩]।

সে সংবাদ পেয়ে হিরাক্লিয়াসের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো আমরা হয়তো জানবো না কোনো দিন। কিন্তু নবীজি যে মনে রেখেছিলেন ‘বুসরা’র সীমান্তকে! মক্কায় সংবাদ আসে পারস্য আর রোমান সম্রাজ্যের যুদ্ধের! পারস্যের জয়ের সংবাদে উৎফুল্ল কুরাইশ পাড়া। মুসলিমরা রোমানদের পক্ষে! কিতাবীদের পক্ষে! ওহী নাযিল হলো রোমানদের বিজয় সংবাদ দিয়ে [সূরা রূম: ২-৩]। নবীজি (সা.) ও মুসলিমদের এ সমর্থনও হয়তো হিরাক্লিয়াসের কাছে পৌঁছেনি। আর যদি সংবাদ পৌঁছেও তাতে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো হিরাকলের তা আমরা জানি না। কিন্তু নবীজি মনে রেখেছিলেন ‘বুসরার সীমান্তকে! হুদাইবিয়ার পর সাহাবী দাহিয়াতুল ক্বালবীকে (রা.) পাঠিয়েছিলেন ‘বুসরায়’।

বুসরার শাসক হয়ে পত্র যাবে রোমান অধিপতি ‘কায়সার’-এর নিকট। সে অধিপতি হেরাক্লিয়াস তখন কেবল পারস্য সীমান্তের ঝড়-ঝাপটা শেষ করে সিরিয়ার হেমস থেকে ‘ইলয়া’ (বায়তুল মাকদিস) এসেছেন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে। এখানে এসে নবীজির পত্র হাতে পেলেন। হিরাকলের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো সে-ই চিঠি পেয়ে তা ইবন আব্বাসের সূত্রে আমরা জেনেছি। আবূ সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফিলা তখন শামে। ডাক পেয়ে তিনি বাইতুল মাকদিসে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে রোমের রাজন্যবর্গের সামনে সুউচ্চ মঞ্চে বসা হেরাক্লিয়াস ও আবূ সুফিয়ানের অলংকারপূর্ণ সংলাপ [বুখারী, ২৯৪১] খুবই শ্রুতি মধুর।

তারপর নবীজির (সা.) আরেকটি পত্র প্রেরণ করেন শামের বুসরার উদ্দেশ্যে। বাহক হারিস ইবন উমাইর আল-আযদী (রা.)। মুতা এলাকায় শুরাহবীল ইবন আমর আল-গাসসানীর হাতে তিনি খুন হয়ে যান। সে ঘটনায় মুতার যুদ্ধের প্রেক্ষিত রচনা করে [যাহাবী, তারীখুল ইসলাম]। সেখানে এখন শায়িত আছেন মুতার শহীদেরা।

তারপর নবীজি (সা.) ইন্তিকালের এক বছর পূর্বেও মদীনা থেকে বুসরা অভিমুখে বাণিজ্য কাফিলা পরিচালনা করেন স্বয়ং আবূ বকর (রা.)। সাথে দুই বদরী সাহাবী নু‘মান ও সুআইত ইবন হারমালা। সুআইত ছিলেন রসিক। সে সফরে দুষ্টুমি করে তিনি নু‘আমানকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন! লোকেরা শিকল পরিয়ে ‘নুমানকে নিয়ে যাচ্ছিলো! সে নিয়ে হাস্যরত হয়েছিলো মদীনায় নবীজির উপস্থিতিতে! [ইবন মাজাহ, ৩৭১৯]

তারপর খালিদ ইবন ওয়ালিদ ৬৩৪ সনে বাইজেন্টাইন শাসন থেকে বুসরা মুক্ত করেন [বালাজুরী, ফুতূহুল বুলদান, ১১৫-১১৬]। বুসরার প্রাসাদগুলো নবুওয়াতের নূরে আলোকিত হয়। এটা সে আলো যা মক্কার হেরেম থেকে উৎসারিত যা নবীজির আম্মাজান আমিনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন! এটা লাওহ মাহফুজ থেকে উৎসারিত সে-ই রশ্মি যা রূহুল কুদস জিবরাঈল জাবালু হেরায় নববী হৃদয়ে বিনিময় করেছেন ! মদীনায় খন্দক খননকালীন বিচ্ছুরিত সে আলো যা কিসরা-কাইসারের শহরের উপর আছড়ে পড়ছিলো। এটা কালাম হাকীমের তাজাল্লী! পূর্ব-পশ্চিমে দিগন্ত জুড়ে এক নূর!

{সাল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মদ (সঃ)}

Tags: , , ,

Rent for add