• ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪

নবীজির ব্যবসায়িক জীবন: বাণিজ্যিক কেন্দ্র-৪: ইয়ামানের বাজার হুবাশা

فَلَمَّا اسْتَوَى وَبَلَغَ أَشُدَّهُ، وَلَيْسَ لَهُ كَثِيرٌ مِنَ الْمَالِ اسْتَأْجَرَتْهُ خَدِيجَةُ ابْنَةُ خُوَيْلِدٍ إِلَى سُوقِ حُبَاشَةَ

“তিনি পরিণত বয়সে পৌঁছালেন অথচ তার পর্যাপ্ত সম্পদও নেই, খুওয়াইলিদ কন্যা খাদীজা তাকে ‘হুবাশার বাজার’-এর উদ্দেশে বাণিজ্যে নিয়োজিত করেন।” [মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, ৯৪৭২]

নবীজি (সা.) মক্কা থেকে জাযিরাতুল আরবের দক্ষিণ সীমান্তের কতদূর পর্যন্ত স্বশরীরে ভ্রমণ করেছিলেন? খাদিজার বাণিজ্য কাফিলা দক্ষিণের ঠিক কোন স্থানে প্রেরিত হয়েছিলো? তিহামার সীমান্ত কতটুকু? কোথায় ‘সূক হুবাশা’? কোন পথে নবীজি (সা.) সে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ভ্রমণ করেছিলেন?

“উরওয়া বর্ণনা করেন: হাকীম ইবন হিযাম ছিলেন এমন একজন ব্যবসায়ী মক্কা ও তিহামার কোনো বাজারে তার উপস্থিতি বাদ পড়তো না। হাকীম বলছিলেন, ‘তিহামায় অনেক বাজার ছিলো, তম্মধ্যে সর্ববৃহৎ হুবাশা বাজার।’ তা ছিলো মক্কা থেকে আল-জানদের পথ ধরে আট ‘মারহাল’ দূরুত্বে। আমি তাতে উপস্থিত হতাম। আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) তাতে উপস্থিত হতে দেখেছি। সেখানে আমি কিছু কাপড় কিনলাম এবং তা নিয়ে মক্কায় ফিরে আসলাম। এটা সে সময়ে যখন খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহকে (সা.) হুবাশা বাজারের পাঠানোর জন্য ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর সাথে প্রেরণ করেছিলেন তার গোলাম মাইসারাকে। তারা উভয়ে রাওয়ানা হলেন এবং আল-জানদের কাপড় ও অন্যান্য পণ্য এবং ব্যবসায়িক কিছু পণ্য কেনা-বেচা করলেন। তারপর তা নিয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করলেন। তাদের সে বাণিজ্যে ভালো লাভ হলো। বাজারটি প্রতি বছর রজব মাসে আট দিন অনুষ্ঠিত হতো। [তাবাকাত আল-কুবরা, ইবন সাদ, ১০৮৩৯]

এ ঘটনার বর্ণনাকারী হাকীম ইবন হিযামকে কে না চেনে? তিনি কুরাইশ বংশের সম্মানিত নেতা ও বিখ্যাত ‘দারুন নদওয়ার’ স্বত্বাধিকারী। খাদিজার চাচাতো ভাই ও যৌবনে নবীজির কাছের বন্ধু। যদিও নবীজির থেকে তিনি পাঁচ বছরের বড়ো [ইসাবা]।

অষ্টম হিজরী পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ না করলেও তিনি নবীজির প্রতি অগাঁধ ভালোবাসা পোষণ করতেন। নবীজি (সা.) ঈমানের দাবীতে মদীনায় চলে গেলেন আর শিরক হাকীমকে মক্কায় আটকে রেখেছিলো। কিন্তু বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা কি আটকে রাখা যায়! একদিন কাবার প্রাঙ্গণে নিলাম হচ্ছে কিছু কাপড়। পঞ্চাশটি স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে সে কাপড় ক্রয় করে নবীজিকে (সা.) উপহার দিতে মদীনায় আসেন হাকীম। কিন্তু কোনো মুশরিকের হাদীয়া তো গ্রহণ করবেন না নবীজি (সা.)। অগত্যা মূল্য গ্রহণ করেই নবীজিকে (সা.) সে উপটোকন দিয়ে আসেন হাকীম [মুসনাদ আহমদ]।

সে হাকীম ইবন হিযাম ‘হাবাশা’র বাজারে নবীজির বাণিজ্যের বর্ণনা দিচ্ছেন। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, হাকীম নিজেও নবীজি (সা.) থেকে সে বাজারে আল-জুনদের কাপড় কিনেছেন [ইবনুল বাক্কার, জামহারাতু নাসাবি কুরাইশ, ১/৩৭১]।

তিহামা! আরব জাজিরার প্রদেশ পাঁচটি। আল-হিজায, নজদ, আল-ইয়ামান, আর-আরূদ আর তিহামা। লোহিত সাগরের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল ‘জাবালু সারাওয়াত’কে প্রস্তে রেখে বাবিল মানদিব থেকে আকাবা উপসাগর পর্যন্ত লম্বালম্বি বিস্তৃত চমৎকার এক অঞ্চল ‘তিহামা’। ইয়ামেনের অংশ ‘তিহামা আল-আসীর’ এবং হিযাজের অংশ ‘তিহামা আল-হিজায’। ইয়ান্বু আর জিদ্দাহ হিজাযের তিহামা আর হুদাইবিয়া মরুভূমি থেকে জাযান পর্যন্ত তিহামা আসীর। ‘সূক হুবাশা’ আসীরের একটি বাজার [মুজাম আল-বুলদান]।

তারীক আল-জানদ! ইয়ামেনের জানদ শহরের রাস্তা। জানদ থেকে পুরনো এ রাস্তা ব্যবহার করে দক্ষিণের হাজীগণ মক্কায় আসতেন। এ কারণে এটাকে কখনো ‘মাহাজ্জাতু হাদামাউত আল-উলয়া, কখনো ‘তারীক আর-কাদীম’ নামেও অভিহিত করা হয়। উসমানীয় যুগে ‘আত-তারীক আল-সুলতানীয়া’ ও সৌদি আমলে ‘আত-তারীক আর-জাদা’ নামকরণ করা হয়। মক্কা থেকে ‘সূক হুবাশা’ পর্যন্ত এ রাস্তায় ইয়ালামলাম, সা‘ঈয়া, আল-খাদরা, আল-লাইস, আল-সিরীন, দাওকা, কানূনা, বারিক নামক শহরগুলো। বারিক ছিলো রাস্তার মোহনা।
বারিকের দিকে যেতে কানূনার উপকন্ঠে ছিলো ‘হুবাশা বাজার’। তারপর আরও অন্তত দু’দিনের পথ ‘বারকুল গিমাদ’, যা এখনকার মানচিত্রে ‘আল-বিরক’। এ পথ ধরে হাবশায় হিজরতের জন্য আবূ বকর ‘আল-বিরক’ পর্যন্ত পৌঁছে যান। ইবনু দাগিনা তাকে ফিরিয়ে আনেন মক্কায়। খিলাফতকালে আবূ বকর (রা.) ‘আল-বিরক’ শহরে তৈরী করেন স্মৃতি মসজিদ।

মারহালা! আট মারহালা! আট রাতের দূরুত্ব! মক্কা থেকে জানদের পথে আট মারহালা [ইবন সাদ, তাবাকাত]।

‘হুবাশা’ বারিকের আবাসভূমিতে যা কানূনার দিকে মক্কা থেকে দূরুত্ব ছয় মারহালা [ইবন হাজার, ফাতুহুল বারী; শিহাবুদ্দীন কুসতালানী]।
পদভ্রজে কিংবা উটে চড়ে এক মারহালা বা এক রাতের দূরুত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটার। ঐতিহাসিকগণের ব্যাখ্যা, বিশেষত আল-আযরাকী এবং আল-বাকরির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুবাশা স্থানটি ওয়াদী কানূনার শুরুতে অবস্থিত যেখানে অপরাপর রাহমান, খাইতান, হাফইয়ান ও বায়ান এই চারটি ওয়াদী একসাথ হয়েছে। এটা ‘হাদবা আল-কুরশা’র দক্ষিণে ‘বালকারন’ এলাকার ‘আল-হাওয়ায়ির’ বা ‘আল-হাওয়ারী’ নামে প্রসিদ্ধ এলাকার পূর্বে এবং ‘আল-ফাইজা’ গ্রামের চার কিলোমিটার পশ্চিমে ‘আবলাহারিস’ নামক গ্রামে অবস্থিত। বর্তমান ‘আল-কানফুজা’ জেলার ‘কানূনা’র এ স্থানটির দূরুত্ব মক্কা থেকে প্রায় চারশত কিলোমিটার।

হুবাশা! মানে একসাথ করা। এখান থেকে অনতিদূরে মিলিত হয়েছে বিভিন্ন রাস্তার মোহনা। পর্যাপ্ত পানি আর খেজুরের সরবরাহ ‘আওসাম’ গোত্রের আবাসভূমিতে মিলিত হতো আরবের বিভিন্ন গোত্র। বণিকদের সাথে একসাথ হতো হাজ্জীরা। স্বর্ণ, গ্রাপাইট, সুরমা ছিলো এখাকার বাজারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা। গম, খেজুর, চামড়ার আড়ত ছিলো। হাজার এলাকা থেকে হরেক রকম মদ আসতো। আল-জানদ থেকে আসতো ইয়ামেনী কাপড়।

এ বাজারে দাস বিক্রি হতো আর সে সাথে কতো স্বাধীন মানুষকে টেনে নিতো দাসের জীবন। যায়িদ ইবন হারিসাকে এ বাজার থেকে কিনেছিলেন মক্কার হাকীম ইবন হিযাম [ইবন আব্দিল বার, আল-ইস্তিআব, ২/১১৫]!

হিজাযের পশ্চিম সীমান্তের মাআনের বালকটি উত্তর সীমান্তের ‘হাইল’ ঘুরে পূর্ব সীমান্তে তিহামার সূক হুবাশায় বিক্রি হয়ে দাসত্বের কবলে পড়ে মক্কায় আসে। ৬ষ্ঠ হিজরীর হুদাইবিয়ার দিবসে বণিক হিসেবে আবূ সুফিয়ান হুবাশার বাজারে অবস্থান করছিলেন [তাবাকাত আল-কুবরা, ইবন সাদ, ১০৭৭৯]।

নবীজি (আ.) এ বাজারের-ই বণিক। অন্যান্য পণ্যের মাঝে কাপড় তাঁর প্রধান বাণিজ্যিক পণ্য। সবচেয়ে উত্তম কাপড়ের বাণিজ্য করেন। ইয়ামেনের জানদের কাপড়। সাথে আছে মাইসারা। বেশ কয়েকবার হয়তো এ কাফিলা তিনি পরিচালনা করে থাকবেন। মক্কায় ফিরে আসেন আনন্দ আর উচ্ছাস নিয়ে।

‘খাদিজার চেয়ে উত্তম কোনো শ্রমিকের তত্ত্বাবধায়ককে আমি দেখিনি! যখনি-ই আমি ও আমার সঙ্গী ফিরে আসি, তাঁর নিকট আমাদের জন্য উঠিয়ে রাখা কিছু খাদ্যদ্রব্য উপটোকন হিসেবে অতিরিক্ত পেয়েছি’। তিনি আরও বলেন, ‘যখন হুবাশা বাজার থেকে ফিরলাম, আমি সঙ্গীকে বললাম ‘চল আমরা খাদিজার সাথে আলাপ করি’।” [মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, ৯৪৭২]

তারপর ১৯৭ হিজরী সন পর্যন্ত হুবাশা বাজার জমজমাট ছিলো। দাউদ ইবন ঈসা ইবন মূসা মক্কার আব্বাসীয় আমীর। প্রতি বছরের মতো এবারও তিনদিনের জন্য একজন বাজারের তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দিলেন। কিন্তু ইয়ামেনের আযদী বংশের কেউ একজন তাকে খুন করে বসলো। মক্কার ফকীহরা আমীরকে জাহিলী হুবাশার বন্ধের পরামর্শ দিলেন। সে সাথে জাহিলীর যুগের সমস্ত বাজারের ন্যায় সর্বশেষ ‘হুবাশাও বন্ধ হয়ে যায় [আল-আজরাকী]।

সম্প্রতি আরব গবেষকদের খোঁজাখোজির অন্যতম আকর্ষণ হুবাশার ঠিকানা। বের হয়ে আসে প্রত্মতাত্ত্বিক দলীল! কিন্তু কোনো গবেষক কী খুঁজে দেখেছেন ইয়ামেন সীমান্তে কাপড়ের বাণিজ্য নবীজির জীবনে কেমন প্রভাব রেখেছিলো?

“আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, একদা নবীজি (সা.) উসামা ইবন যায়িদের (রা.) কাঁধে ভর করে বের হয়ে আসলেন। তাঁর পরনে ছিলো একটি ইয়ামেনী নকশী কাপড়। তারপর তিনি লোকদের নামাযের ইমামতি করেন। [মুসনাদে আহমাদ, ১৩৭৮৭]

“আইশা (রা.) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহকে (সা.) তিনটি ইয়ামেনী সাদা চাদর দিয়ে কাফন পরানো হয়’ [বুখারী, ১২৬৪; মুসলিম, ৯৪১]।
? সাল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মদ ?

Tags: , , ,

Rent for add